সবটা অন্যরকম♥ পর্ব_৮

সবটা অন্যরকম♥
পর্ব_৮
Writer-Afnan Lara
.
হাঁচির পর্ব শেষ করে পকেট থেকে কালো রুমালটা নিয়ে কোনোমতে আহনাফ নাক লুকালো
এরপর চোখ খুলে দেখলো মিনি আরামসে ওর বালিশের উপর শুয়ে আছে
আহনাফ উঠে দাঁড়িয়ে হাঁচি দিতে দিতে বললো”ওরে সরাও দিবা
তোমার এই আজাইরা বিলাই আমার বিছানার মাঝখানে গিয়ে শুয়েছে,কত বড় সাহস হলে এমনটা করতে পারে
.
দিবা ছুটে এসে মিনিকে ডাক দিলো,কিন্তু মিনি তা না শুনার ভান করে মনের সুখে ঘুমাচ্ছে
দিবা এগিয়ে এসে ওর পেট জড়িয়ে ওকে কোলে তুলে নিয়ে গেলো চুপচাপ
আহনাফ বিছানায় এসে বসতেই ওর আবারও হাঁচি শুরু হয়ে গেলো,বিছানায় মিনির পশমে ভর্তি হয়ে আছে
দিবাকে আবারও ডাকলো সে
দিবা মিনিকে রুমে ছেড়ে দিয়ে এক ছুটে এসে বললো”আবার কি?”
.
আমার বিছানায় নতুন বেড কভার লাগিয়ে দাও,তোমার আজাইরা বিড়াল পশম দিয়ে একসাথ করে ফেলছে সব
.
আজাইরা বিড়াল বলবেন না,ওর নাম মিনি,ছোট এই নামটা বলতে আপনার এত কিসের কষ্ট?
.
এই শুনো তোমার বিড়ালটাকে আমি একটুও লাইক করি না
তাও চুইংগামের মতন আমার আশেপাশে থাকে সবসময়,,ওরে আজাইরা বলবো না তো কি বলবো?
ও বিছানার বারোটা বাজিয়েছে,ওর বোন হিসেবে এখন তুমি বিছানা করে দিবা
.
দিবা ব্রু কুঁচকে ওয়ারড্রব থেকে একটা বেড কভার নিয়ে বিছিয়ে দিয়ে পুরানটা হাতে নিয়ে চলে গেলো
আহনাফ নাক মুছতে মুছতে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিলো সেসময়ে

খালামণি দুপুরের খাবার টেবিলে আনতে আনতে বললেন”দিবা??কেমন লাগলো প্রথমদিন?”
.
আহনাফ চেয়ার টেনে বসে খাবারের প্লেটটা ছুঁয়ে বললো”ও ক্লাসেই যায় নাই,বইখাতা কিনি নাই বলে”
.
তোরে এটা আবার বলে দিতে হবে?ওর বই খাতা কিনিস নি কেন?
.
আমার এত সময় নাই,এখন একটু ঘুমিয়ে ডিউটি যাবো আবার,,আরিফকে দাও বইখাতা আনানোর কাজ
.
দিবা চুপচাপ নিজের খাবার থেকে মাছ বেছে নিচ্ছে মিনির জন্য,মিনি দিবার ওড়নার সাথে লেগে লুকিয়ে আছে,আহনাফের ধমকে ওর ভয় করছে এখন
দিবা মিনির বাটি পুরিয়ে নিচে রাখলো তারপর ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বুঝালো খাওয়ার জন্য
মিনি এক পা এক পা করে বাটির কাছে এসে খাওয়া শুরু করে দিয়েছে সব ভুলে
.
খাবারটা জলদি শেষ করে আহনাফ রুমে এসেই শুয়ে পড়েছে,,ঘন্টাখানেক ঘুমিয়ে আবার ডিউটিতে যেতে হবে তার
ফোন ভাইব্রেশনে দেওয়া ছিলো,,মনে হচ্ছে পুরো বিছানা কাঁপছে,এসময়ে আবার কে কল করতে পারে??
.
আহনাফ বিছানার চাদরের নিচ থেকে ফোনটা কোনোমতে বের করে দেখলো আননউন নাম্বার,,রিসিভ করে হ্যালো বলে যা শুনলো সে তাতে তার কপালে ঘাম এসে গেছে
লাফ দিয়ে উঠে বসে পড়লো আহনাফ মিঃ বাবলুর কন্যা মিশকার গলা শুনে
আহনাফ কিছু বলছে না দেখে মিশকা মিষ্টি করে বললো”কি হলো নাফি,ভাবছো কি করে নাম্বার পেয়েছি?তোমার নাম্বার বাপি এনে দিয়েছে আমায়,জানোই তো আমার বাপিকে তোমাদের বারের সব কর্মচারী আসতে সালাম দেয় আবার যেতে সালাম দেয়
বাট ইউ!!!
মাই গড এত এত অহংকার তোমার আসে কই থেকে?
তুমি জানো আমার পিছনে ছেলেরা ঘুরে,আর আমি তোমার পিছনে ঘুরছি,কেন জানো??বিকজ আই লাইক ইউ,এন্ড আই নিড ইউ রাইট নাও
আজকে আমার বাসায় বাপি আর মাম্মাম নেই,আমার বড় ভাইয়া ভাবীর সাথে ঢাকার বাহিরে গেছে ভাবীদের বাসায়
তুমি এখন আমার বাসায় আসবে,তোমার আজকের ডিউটি থেকে ছুটি আনিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমার
.
কথা শেষ?
.
হুম যা বলার বলেছি,এবার তুমি বলো কখন আসবে,বাসায় কিন্তু আমি একা,আমার খুব খিধে পেয়েছে
আর সেটা হলো নাফির খিধা,আর ওয়েট হয় না,জলদি চলে আসো
.
আহনাফ ফোন পকেটে ঢুকিয়ে আয়নায় নিজের দিকে এক নজর তাকিয়ে মুচকি হাসলো তারপর পায়ের উপর পা তুলে ফোনটা ঘুরিয়ে কল লাগালো নাহিদকে
.
নাহিদকে কল করা শেষে আবারও শুয়ে পড়লো আহনাফ
যা মনে হয় এই চাকরিটা আর হাতে থাকবে না,এটা যতদিন আছে ততদিনে আরেকটা ধরে ফেলতে হবে তা নাহলে এত কিছুর খরচ কই থেকে দেবো,এর ভেতর দিবার খরচ যোগ হয়েছে সাথে ওর আজাইরা বিড়ালটারও

কলিংবেল বাজছে,আজ কাজের লোক নয় বরং মিশকা দৌড়ে আসলো দরজা খুলার জন্য,তার ধারনা নাফি এসেছে
দরজা খুলতেই দেখলো নাহিদ দাঁড়িয়ে আছে,পরনে নাফির সেই কালো জ্যাকেট,কালো মাস্ক আর কালো চশমা,,প্রথম দেখায় মিশকা ওকে চিনতেই পারলো না
জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে
এরপর যখন নাহিদ চশমা খুললো তখনই পিছিয়ে গেলো মিশকা
নাহিদের হাতে পিজ্জার প্যাকেট
সে এগিয়ে ধরে বললো”নাফি ফোন করে জানালো আপনার নাকি খিধে পেয়েছে,বাসায় আপনি একা,তাই আমাকে দিয়ে খাবার পাঠিয়ে দিলো,আর কিছু লাগবে ম্যাম?”
.
হোয়াট ননসেন্স!!!!! নাফি কোথায়?
.
ওর এখন যেখানে থাকা উচিত সেখানেই
আচ্ছা আসি ম্যাম
সত্যি তো আপনার কিছু লাগবে না?আপনি যখন এতই একা আমি সহ থেকে যাই??এক সাথে টাইটানিক দেখবো
.
গেট আউট ফ্রম মাই হাউজ
.
মিশকা রেগেমেগে হনহনিয়ে চলে গেলো নিজের রুমে,,নাহিদ দাঁত কেলিয়ে বের হওয়ার সময় নাফিকে ফোন করে জানিয়ে দিলো সবটা
নাফি বারে বসে হাসছে,হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাচ্ছে
এই খুশিতে এক ঢোক বিয়ার খেয়ে ফেললো সে
এই মেয়ে আমার চাকরি খাবে তা ভালো করে জানা হয়ে গেছে,তাই মজাটা নিয়ে নিলাম,কেমন লাগলো মিস চুইংগাম!??
.
ভাই তুই এত এ্যাটিটিউড পাস কার থেকে?
.
মিহালের কথায় আহনাফ এদিকে ফিরে বসলো তারপর বললো”এ্যাটিটিউড বজায় না রাখলে আমার হবুকে সকল প্রকার খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখবো কি করে?”
.
তুই খারাপ কিংবা ভালো কাজ করলে তোর হবুর সাথে এর কি সম্পর্ক?
.
যে যেমন চরিত্রের অধিকারী তার জীবনসঙ্গী ও ঠিক সেই চরিত্রের অধিকারী হবে
সো আই বিলিভ! আমি ভালো হলে আমার স্ত্রী ও ভালো হবে,আজ আমি এ্যাটিটিউড দেখাচ্ছি কাল আমার স্ত্রী এ্যাটিটিউড দেখাবে অন্য কোনো ছেলেকে
বুঝলে মিহাল ব্রো??
.
মাঝে মাঝে এমন কল্পনায় থেকে কথা বলস যে মনে হয় এই বুঝি তুই তোর স্ত্রীকে পেয়ে গেলি
.
পেয়ে তো গেছি,সে থাকে কল্পনায়,একদিন ঠিক সামনে এসে দাঁড়াবে
.
তা কিরকম দেখতে তোর সেই জীবনসঙ্গী?? জানতে পারি?নাকি সেটাও বলা নিষেধ?
.
সে হবে আমার মনের মতন,,আমি না খোলা চুল পছন্দ করি না একটুও,,
সে খোঁপা করে রাখবে,খোঁপায় বেলি ফুলের মালা ঝুলাবে,,ঠোঁটে লাল টুকটুকে লিপস্টিক থাকবে,,নাকে ছোট সাদা পাথরের নাকফুল,,আর কানে ছোট দুল,,তার গায়ের রঙ হবে আনকমন
সাদা ও না,কালো ও না,এমনকি শ্যামলাও না,,জাস্ট এমন একটা রঙ যেটায় পানি পড়লে ঝলক মেরে ওঠে
তার কথাবার্তায় আমি দিন দিন তার প্রেমে পড়ে যাবো
আর সে মিশকা টাইপ মেয়ে হবে না,সে অনেক লজ্জাবতী হবে,আমাকে নিয়ে তার এসব ধারনাই থাকবে না
সে আমায় আমার চেহারা দেখে নয় বরং আমার ভেতরের মানুষটাকে বুঝে ভালোবাসবে যাতে এই রুপে দাগ পড়লেও তার ভালোবাসায় কমতি না হয়
আর তার..
.
ভাই থাম!!এত এত চাওয়া বাপরে বাপ!
.
বুঝতে হবে!!আমি তার জন্য প্রেমে জড়াইনি আজ পর্যন্ত,,সো তাকে বেস্ট হতেই হবে
.
আচ্ছা তুই বুঝবি কি করে যে সে তোর জীবনে এসে গেছে,আই মিন তাকে পাবি কি করে??
.
ঐ যে মনে মনে মিল,তাকে পেয়ে গেলে আমার মন আমায় বলে দেবে এই সে মেয়ে যাকে তুমি খুঁজতেছো
.
তোর ঐ কল্পনার মেয়ে আসতে আসতে আন্টি তোর জন্য মেয়ে দেখাও শুরু করে দেবে
.
হতে পারে তাদের মধ্যে একজন হয়ে যাবে,,এখন আর ভাবি না,যে আসার সে এসেই যাবে

তোর কি দরকার ছিলো ঐ লোকটার রুমে ঘুমানোর??আমার বিছানায় ঘুমালে আজ না তুই বকা খেতি আর না আমি খেতাম
এই লোকটা তো শুধু দিক খোঁজে আমাকে আর তোকে বকার জন্য,আর কোনোদিন ঐ লোকটার রুমের ধারের কাছেও যাবি না,বুঝেছিস?
.
মিনি অসহায় একটা লুক নিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে আছে,,দিবা ওকে নিয়ে ছাদে এসেছে
ছাদে যে ও একা তা কিন্তু নয়,আরও লোক আছে
দুটো মেয়ে আছে এপাশের দিকে,ওরা টিকটক ভিডিও করছে,,আর ওদিকটায় দুটো ছেলে ফোন টিপছে বসে বসে
মাঝখানটায় আন্টি একজন শুকোতে দেওয়া মরিচ পলিথিনে ভরছেন
দিবা মিনিকে নিচে ছেড়ে ছাদের রেলিং ধরে দূর দূরান্তের দালান গুলো দেখায় মন দিলো,,সবার বারান্দা দেখলে বুকটা খালি খালি লাগে,,আমি কবে আমার বারান্দা সাজাবো, কি করে টাকা কামাবো?
.
দিবা বাতাস অনুভব করতে চোখ বন্ধ করে হাত দুটো একটু উঁচু করলো
ঝড়ো হাওয়ায় ওর গায়ের থেকে জর্জেটের ওড়নাটাই উধাও করে দিলো
দিবা চোখ খুলে তো অবাক,ওর গায়ের কমলা রঙের ওড়নাটা কিনা সামনের বিল্ডিংটার ছাদে গিয়ে ঝুলে পড়েছে
.
টিকটক করা মেয়েগুলো ফিক করে হেসে দিয়ে বললো”এত বাতাসে নায়িকা ফিলিং পোজ দিতে গিয়ে ওড়নাটাই হারাইছে!”
.
জলদি করে খোঁপা থেকে চুল ছেড়ে সামনে টেনে মিনিকে কোলে তুলে ওড়নাটার দিকে চেয়ে থাকলো দিবা
মেয়েগুলোর কথায় পাত্তা দিলো না
কারণ ওরা নিজেরাই নায়িকাদের অঙ্গভঙ্গি নকল করে টিকটক করে সেদিকে ওদের খেয়াল নাই আসছে আমাকে নিয়ে হাসতে
যদি আমার চেয়ে তারা ভালো হতো তাহলে কথাটা আমার গায়ে লাগতো,বাট কথাটা আমার গায়ে লাগেনি কারণ ওদের চেয়ে বরং আমিই ভালো,অন্তত ভিডিও বানাইতে যাই নাই
আবেগে হাত দুটো উঁচু করলে ওড়না হারাবো জানলে এমনটা করতাম ও না
আমার এত সুন্দর কমলা রঙের ওড়নাটা কি এভাবে নষ্ট হবে?
আমি বরং যাই নিয়ে আসি
.
দিবা মিনিকে নিয়ে চললো সেদিকে,সামনের বাসাটা ১২তলার
গেট পর্যন্ত এসে ঢুকতে যেতেই দারোয়ান আটকালো ওকে
.
প্লিস আঙ্কেল যেতে দিন না,,আমার জরুরি কাজ আছে,
.
তুমি এই বাসার কার কি হও??তার নাম বলো,ইন্টারকমে ফোন দিয়ে শিউর হওয়া ছাড়া ভিতরে ঢোকা নিষেধ
.
এই বাসার কেউ আমার কিছু হয় না
.
তাহলে ওদিকে তাকিয়ে চলে যাও,এই বাসায় ঢোকা যাবে না
.
দিবা মন খারাপ করে চলে আসলো বাসায়,,ওড়নাটা কি তাহলে পাবো না?

এই এই আমার মা ফোন করেছে,তোরা সামলা আমি দুই মিনিটে আসতেছি
.
আহনাফ ফোন নিয়ে বার থেকে বেরিয়ে কলটা রিসিভ করলো
.
কিরে আহনাফ কই তুই?
.
কোথায় আবার,অফিসে
.
তোর হাত ভালো হয়েছে?ব্যাথা করে?
.
আহনাফ ঢোক গিলে হাতের দিকে তাকালো তারপর বললো”আমার হাতে আবার কি হবে?”
.
মিথ্যা বললে আজ আমার হাতে চড় খাবি তুই
.
এই মেয়েটা মাকে সবটা বলে দিয়েছে,ওর কোন পাকা ধানে মই দিয়েছিলাম আমি??
আজ ইচ্ছামত টাইট দিব,আমাকে বাসায় আসতে দাও শুধু
.
কিরে কথা বলছিস না কেন?হাতে মলম লাগিয়েছিলি নাকি এমনি এমনি রেখে দিছস!
.
আরে কিছু না,,নরমাল একটা ব্যাপার,,এমনি ঠিক হয়ে যাবে,আমি রাখি কেমন?
.
আহনাফ লাইন কেটে দিয়ে গাল ফুলিয়ে তার সিটে এসে বসলো,,মেজাজ বিগড়ে আছে অনেক,দিবাকে এত করে বললাম মাকে যেন না বলে শেষে কিনা বলে দিলো??
আজকে ওরে ধুয়ে আমি আমার বারান্দায় শুকাতে দেবো
.
দিবা দরজা ফাঁক করে এতক্ষণ খালামণির কথা শুনছিলো
আহনাফের হাত কাটা এটা সে খালামণিকে বলেনি তাহলে তিনি জানলেন কি করে??
ঐ লোকটা তো এখন ভাববে আমি বলে দিয়েছি,কোথায় ভাবলাম উনাকে দিয়ে আমার ওড়নাটা আনাবো এখন তো মনে হচ্ছে “আপনি বাঁচলে বাপের নাম”
.
কিরে দিবা ওখানে কি করিস,এদিকে আয়,,আমি আর তুই মিলে চা খাবো
আর বলিস না আহনাফটা একদম বাচ্চাদের মতন,হাত কাটা গেলো একটু মলম ও লাগায়নি,আমাকে বলে ও নাই,মানে যতক্ষন না আমি মলম লাগিয়ে দেবো
.
তুমি জানলে কি করে যে উনার হাত কাটা গেছে?
.
বিকালবেলা ওর রুমে এসেছিলাম গুছানোর জন্য,হাত পা ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছিলো সেসময়ে ওর হাত কাটা দেখে আমার তো চোখ কপালে,ছুটে গেলাম মলম আনতে
এসে দেখি ও নাই,ওর ব্যাগ ও নাই জুতাও নাই,আমি আসার আগেই ডিউটিতে চলে গেলো
চলবে♥

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here