মেঘের_বন্ধু_বৃষ্টি (২)

#মেঘের_বন্ধু_বৃষ্টি (২)

জীবনে বিরহ বেড়ে গেলে মানুষ রবী ঠাকুরের গান শুনে। আর তিয়া তার বিপরীত নিয়মে গিয়ে জাস্টিন বিবারের গান শুনে চলেছে। সাউন্ড এতো বেশি যে ঘরে ঢুকেই কান চেপে ধরলো আওয়ান। জীবনের সব থেকে বড় ভুল মেয়ে বন্ধু! এই মেয়েরা জীবন দশায় প্রচন্ড আবেগী হয়।আর এদের আবেগ সামলানোর মতো বিশাল দায়িত্ব খানা উড়ে এসে জুড়ে পরে ছেলে বন্ধুর ঘাড়ে। সাউন্ড বক্স অফ হতেই বিছানা থেকে মুখ তুলে তাকালো। কিন্তু আওয়ান কে দেখে ও কোনো রকম প্রতিক্রিয়া না দিয়ে ঠায় শুয়ে রইলো আগের মতো। কোমড়ে হাত গুঁজে আওয়াজ বলল
” ভারসিটি যাস না ক্যান? ”

” মন চায় না। ”

” সামনে যে টেস্ট পরীক্ষা আর তারপর ফাইনাল সেই ধ্যান আছে। ”

” হু আছে। যা এখন বিরক্ত করিস না। ”

” দেখ তিয়া এই ঝড় বৃষ্টির মাঝে এসেছি শুধু তোর মুড ঠিক করতে। আমার কথা টা শোন। ”

” তুই আমার মুড আরো নষ্ট করে দিয়েছিস। ”

” আশ্চর্য! মানুষ কি আর প্রেমে ছ্যাঁকা খায় না। কয় জন এমন বিরহ পালন করে বল তো?”

” তুই কি যাবি না আমার সামনে থেকে। ”

” না যাবো না। ”

দুজনেই নাছোড়বান্দা। কেউ কাউ কে এক চুল ছাড় দিতে রাজি নয়। আকাশে মেঘ ডেকে চলেছে। এখনি বৃষ্টি এসে আলিঙ্গন করবে ধরায়। সামনেই ফাইনাল পরীক্ষা। পড়াশোনায় ঢিল দিলে যা তা হতে পারে।কেউ চায় না তাঁর জীবন থেকে একটি বছর বৃথা যাক।

তাহমিদার সাথে কথা বলছে আওয়ান। সেই আলোচনা শোনার জন্য কান পেতে আছে তিয়া। তবে এতে তেমন সুবিধা করা গেল না। কথা শেষ করেই ড্রয়িং রুমে এলো। তিয়া রিমোর্ট দিয়ে চ্যানেল পাল্টে খাবার খেতে লাগলো। টিভি তে কার্টুন চলছে এখন। অথচ কার্টুন পছন্দ নয় মোটে ও। সব টা বুঝতে পেরে অন্তরালের অযাচিত দীর্ঘশ্বাস লুকালো। ছাতা খুলে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে এলো। দরজার কাছে এসে থামলো তিয়া। আওয়ান গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। ছাতা থাকা সত্তেও শরীরের এক অংশ ভিজে একাকার। চোখ মুখ কুঁচকে রইলো কিছুক্ষণ। আওয়ান আবার ফিরে এলো। তিয়া কোনো প্রশ্ন করবে তার আগেই কিছু টা পানি ছিটিয়ে দিলো ওর গাঁয়ে।
” এটা কি হলো? ”

” বৃষ্টির সাথে বন্ধুত্ব। ”

” যত্তসব! ”

” কাল ভারসিটি তে দুটো বাজে পার্টি আছে। তুই না আসলে আমি কিন্তু ফিরবো না আর। ”

” যাবো না আমি। ”

” তিয়া আম সিরিয়াস। ”

” আমি ও। ”

মেইন গেটের কাছ থেকে তুমুল গতি তে হর্নের শব্দ করে যাচ্ছে জিমাম। এই ঝড় বৃষ্টির মাঝে পরম নিরুপদ্রবে ঘুমিয়ে ছিলো নিজ বাসাতে। তবে বন্ধুর প্রয়োজনে ছুটে আসতে হলো তাকে। ছাতা টা গুটিয়ে নিয়ে গেটের কাছে এলো আওয়ান। জিমামের অন্তরালে বিরক্তি তবে চোখে মুখে তাঁর প্রকাশ নেই।বাইক এর পেছনে বসতেই সুর সুর গতিতে চলতে লাগলো বাইক। দুই বন্ধুই বৃষ্টি তে ভিজে চিপচিপে।

কাক ভেজা হয়ে ফিরেছে আওয়ান। ছোট বোন আরুশি একের পর এক প্রশ্ন তুলে যাচ্ছে। যার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছে না ছেলেটা। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছে ভেতরে চলে এলো। এক হাতে শার্ট প্যান্ট রেখেই আরুশি আবার প্রশ্ন করলো
” সত্যি করে বল তো ভাইয়া এই ঝড় বৃষ্টির মাঝে কোন রাজ কার্য সম্পূর্ন করে এলি।”

” কেন। তুই জেনে কি করবি! ”

” বৃষ্টির পানি তো তোর ভালো লাগে না। অথচ সেই বৃষ্টির মাঝেই বের হয়ে গেলি হঠাৎ।

” তো! এটা নিয়ে এতো মাতামাতির কি আছে। ”

” সেদিন যে আমি বললাম পাশের দোকান থেকে একটা ফেস প্যাক এনে দে তখন তো বৃষ্টির দোহাই দিলি। ”

” হুম দিয়েছিলাম। ”

” তাহলে আজ কি করে গেলি? ”

” তুই বুঝবি না গাঁধা। এখন ধর তো ফোন আর ওয়ালেট। পুরো ভিজে গেছে ফোন। কে জানে অক্ষত আছে কি না। ”

আরুশির কপালে হালকা করে চাপর মেরে বাথরুমে ছুট লাগালো সে।এই ভরা সন্ধ্যা তে কাক ভেজা শরীরে ঘরে এসেছে সেটা যদি কোনো ভাবে মায়ের নজরে পরে তাহলেই লঙ্কাকান্ড ঘটে যাবে। যা কাম্য নয়।

*

তামজীদ খন্দকারের এক মাত্র সন্তান তিয়া। জীবনে না পাওয়া বলতে কোনো অপশন নেই। প্রয়োজনের আগেই সব কিছু দেখেছে। সেই হিসেবে এক লম্পট ছেলের জন্য শোক পালন করা বোকামি ব্যতীত আর কিছু নয়। তবে এতো সহজে ট্রমা থেকে বের হতে পারছে না। সারাক্ষণ ক্ষুধার্ত বাঘিনীর মতো প্রতিশোধের অনল বয়ে চলেছে। এতো বড় প্রতারণার স্বীকার আগে কখনো হয় নি যে। তাই বক্ষঃস্থল টা একটু বেশিই বিক্ষত।

সকাল থেকে দুই বার খাবারের জন্য ডেকেছেন তাহমিদা। তবে বিছানা থেকে দেহপিঞ্জর সরছেই না। আবারো ডাক দিলেন তিনি। অলস ভঙ্গিতে উত্তর করলো তিয়া।
” আমি আরো ঘুমাবো মা। ”

” সেকি কথা। তাহলে ভারসিটি যাবি কখন। ”

” আমি তো ভারসিটি যাবো না আজ। ”

মেয়ের জবাবে সন্তুষ্ট হলেন না তিনি। তাই ছুটে এলেন এক প্রকার। তিয়াশার রাগ অভিমান সম্পর্কে খুব ভালো করে জ্ঞাত। তাই অনুনয় করে বললেন
” কাল কতো আশা নিয়ে বাসায় এসেছে ছেলেটা। আর আমি তো খুব জোর দিয়ে বলেছি যাবি তুই। বিষয় টা কেমন দেখায় না এখন। ”

” আমাকে না জিজ্ঞাসা করে কেন বলো এমন কথা। ”

” দেখ মা জীবন টা অনেক বড়। বয়স কতো তোর। মাত্র জীবন দেখতে শুরু করেছিস। এখনি ভেঙে পরেছিস। ”

” আমি ভেঙে পরি নি মা। শুধু রাগ হচ্ছে খুব। আমার সাথে এমন টা কি করে করলো! ”

” আহা জাহান্নামে যাক না সেসব। এখন বিছানা ছেড়ে উঠ ফ্রেস হয়ে নাস্তা কর তারপর ইচ্ছে হলে ভারসিটি যাবি না হলে না। ”

তাহমিদার কথা কে সম্মান করে বাথরুমে গেল তিয়া। আয়নার কাছে আসতেই রওনাক এর চেহারা মনে হলো। আক্রোশে হাতে থাকা পেস্ট বক্স ছুঁড়ে মারলো। ঝন ঝন শব্দ তুলে কয়েক টুকরো হয়ে গেল মিরর। এক অংশ লেগে আছে আর তাঁতে নিজের মুখচ্ছবির অস্পষ্ট কিছু অংশ দেখা পেল। যা ভয়ঙ্কর তিমিরাচ্ছন্ন।

খিটমিটে মেজাজের মেয়ে সানিন। সকলের কাছে এমন বিরূপ প্রকৃতি তেই পরিচিত। মুখে হাসির রেখা পাওয়া যেন কোনো বিরল কাহিনী। সকলের ভালো মুড কে নষ্ট করে দিতে পারে মুহূর্তেই।তাই বন্ধুরা তেমন একটা পছন্দ করে না ওকে।
তবে আওয়ান সবার থেকে আলাদা। সানিন কে খুব আগলে রাখে। মেয়েটার মন বোঝার শক্তি যেন সৃষ্টিকর্তা এক মাত্র ওর মাঝেই বপন করে দিয়েছেন। অবশ্য এতে বাকিরা অনুরাগশূন্য। তবু ও সবাই এগিয়ে চলেছে মানিয়ে নেওয়ার এক নিষ্ফল চেষ্টায়।
” হেই সকলের কি অবস্থা? ”

” ভালো। আজ এতো লেট কেন তোর। ”

” আসলে আমার কাজিন এসেছে। ওর সাথে আড্ডা দিতে গিয়ে লেট হয়ে গেল। কিন্তু আওয়ান কোথায়, আসে নি আজ? ”

” এসেছে তো। ”

” আসছে যখন তো কোথায় মহারাজ? ”

” সেটা তো ঠিক জানি না। ”

চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে বসলো সানিন। মর্ডান ফ্যাশনে চলা ফেরা করে সব সময়। সেই কারনে পাছে লোকে নানান কথাই শোনায়। তবে সামনে কারো টু শব্দ টি নেই।
” হেই আওয়ান। ”

” সানিন! ওয়াও, তুই আজ এলি যে। সূর্য ঠিক ঠাক উদয় হয়েছে তো। ”

” বেশি বেশি হচ্ছে। এমনি তেই আসতাম কাল থেকে। তবে শুনলাম কি যেন পার্টি হচ্ছে আজ। ”

” ভালোই করেছিস। আসলে আমি তো বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম তোর কথা। ”

কথা টা বলেই হাসতে শুরু করেছে আওয়ান। এই হাসি টা বিশেষ পছন্দ হলো না সানিনের। তবে সে গুলো কে গাঁয়ে মাখলো না এই সময়ে। বরং ব্যাগ থেকে এক টা বক্স বের করে বলল
” এটা তোর। ”

” কিন্তু সানিন এখন না। ”

” প্লিজ। ”

সকলের মাঝে উপহার গ্রহন করতে পছন্দ করে না আওয়ান। তবু ও জোড়পূর্বক হাসার চেষ্টা করে বক্স টা নিলো। হয়তো বা কোনো বড় ব্যান্ড এর ঘড়ি আছে এতে। যা পরে থাকবে কাবাডের কোনো এক এলো মেলো কোনে।

গাড়ি দিয়ে চলাফেরা করে তিয়া। তবে সেটা সব সময় নয়। মূলত বিলাসিতা সহ সকল কার্যক্রম ওর মনের উপর নির্ভর করে। পরিবারের এক মাত্র মেয়ে হওয়ায় কারো সাধ্য নেই কিছু বলার। তবে আজ গাড়ি ছাড়াই বের হলো। দারোয়ান অবশ্য বললেন গাড়ির কথা। তিয়া নাকোচ করে বললো রিক্সা ডেকে দিতে।কথা মতো রিক্সা ডেকে দিলেন দারোয়ান। বাতাবরণ কবোষ্ণ নয় আবার শীতল ও নয়। কেমন যেন গুমোট বসন্ত বসন্ত ভাব। তবে মূলত এখন চলছে বর্ষাকাল। খট খট আওয়াজ করে এগিয়ে যাচ্ছে রিক্সা। কি সুন্দর জাদু রয়েছে যন্ত্রটি তে। ড্রাইভার মামার পায়ের ছোঁয়া তে চলছে মাইল এর পর মাইল। পৃথিবীর সকল সৃষ্টিকর্ম বড় আশ্চর্যজনক! এসব ভাবতে ভবাতে ভারসিটির কাছে চলে এসেছে তিয়াশা। রিক্সা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে দিলো। ব্যাগ টা ভালো করে কাঁধে নিতেই চোখ যায় রোডের ওপাশে থাকা এক আইসক্রিম পার্লারে মেইন ফটকে। জোড়ালো হাসির সাথে মেতে আছে সানিন আর আওয়ান। মেয়েটার ভাব ভঙ্গিমা কখনোই ভালো লাগে না ওর। মনে পরে যায় প্রথম দিনের কথা। সেদিন কি অপদস্থ টাই না করেছিলো ওকে। পরে অবশ্য ক্ষমা ও চেয়েছে। তবে তিয়ার ক্ষোভ মিটে নি।

✍️
#ফাতেমা_তুজ
#চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here