মেঘের_বন্ধু_বৃষ্টি (৩)

#মেঘের_বন্ধু_বৃষ্টি (৩)

আইসক্রিমের বিল মিটিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে শপ থেকে ঝড়ের গতিতে বের হয়ে এলো আওয়ান। কিছুক্ষণ পূর্বেই ভারসিটির গেট দিয়ে তিয়াশা কে যেতে দেখেছে। সানিন কিছুই বুঝলো না। হাতে থাকা আইসক্রিম টা গলে গেছে বেশ কিছু টা। সেটার দিকে তাকিয়ে হতাশার শ্বাস লুকালো। জীবন উপ্যাখান একেক সময় একেক রকম। এই মুহুর্তে যে তোমার সাথে আছে কাল সে না ও থাকতে পারে। সবাই শুধু উপর দিয়ে বিবেচনা করে, কার সময় আছে অন্য কারো অন্তকর্নের খোঁজ রাখা।

” স্যরি এভরি ওয়ান। ”

” রাখ তুই তোর স্যরি। এই ইহজগতের সব থেকে লেট ব্যক্তি টা হলি তুই। ”

” তাই! এক্সাম হলে কার লেখা সবার আগে কম্পলিট হয় বল তো? আর ভারসিটি শেষ হলে কে সবার আগে বের হয়। ”

” সেটা তো তোর এক্সট্রা একটিভিটি। তবে ভারসিটি তে সবার লেট তো তুই ই ঢুকিস তাই না। ”

” তো হলো তো, ক্রস ক্রস। ”

সুমিতার শব্দভাণ্ডার এবার খালি। বরাবর ই যুক্তি দিয়ে ক্রস ক্রস করে মুক্ত হয়ে যায় তিয়া। এই মেয়ের সাথে কথায় পারা মুশকিল। মাত্র ই চিপ্স এর প্যাকেট টা খুলেছে জিমাম। চার পাশ থেকে চার টা হাত সব গুলো চিপ্স নিয়ে নিলো। ঘটনা টা এতো টাই দ্রুত ঘটলো যে প্রতিবাদের সুযোগ পেল না। বিহ্বল হয়ে যাওয়া মুখের পানে তাকিয়ে হেসে উঠলো চারজন। কয়েক সেকেন্ড পর সেই হাসির সাথে যোগ দান করলো জিমাম নিজেও। বন্ধু মানেই খাবারে ভাগ বসানো আর বন্ধু মানেই এক আত্মা দুইটি প্রান উহু এদের ক্ষেত্রে এক আত্মা ছয় টি প্রান। মাঝে শুধু পেন্ডিং হয়ে আছে সানিন। মেয়ে টার সাথে সকলের বনিবনা হয় না তেমন। তবে বন্ধু মহলের এক টি আসন তাঁর জন্য বরাদ্দ করে দিয়েছে সকলের প্রিয় আওয়ান। তবে এই সপ্তম আত্মা টা সকলের থেকে আলাদা।

ক্লাসের সম্মুখে এসেই থেমে গেল পাঁচ জোড়া বিচলিত
পা। প্রচন্ড শক্ত পোক্ত হয়ে সটান হয়ে দাঁড়ালো। একে একে সবার আগা গোড়া পরখ করলেন প্রফেসর শঙ্কর ভট্টাচার্য। ভদ্র লোকের নামের মতোই ভয়ঙ্কর তেজ বিদ্যমান। কাপাকাপি শুরু হয়ে গেছে ওদের।
” অল ইজ ওয়েল। বাট ক্লাস টাইমে লেট করা ভেরি বেড। ”

” স্যরি স্যার। ”

পাঁচ জনে এক সঙ্গে বলায় ছোট খাটো টর্নেডোর মতো আওয়াজ হলো। শঙ্কর ভট্টাচার্য গোল গোল করে তাকিয়ে থেকে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। আহ্লাদে আত্মহারা পাঁচ জোড়া পায়ের গতি এমন দেখালো যেন ঝড়ো হাওয়া বয়ে চললো এই মাত্র।
” তিয়া এদিকে আয়। ”

সিট খালি করে দিলো আওয়ান। মূলত তাঁর জন্যই অপেক্ষা করছিলো। ক্যাম্পাসে ঢোকার পথে দুর্ভাগ্য বসত প্রফেসর এর সাথে দর্শন হয়। আর মন না টানা সত্তে ও ক্লাসে আসতে হলো।

প্রফেসর শঙ্কর স্যার ম্যাথ করাচ্ছেন। পুরো ক্লাসে একটা মশার গুন গুন অব্দি নেই। হোয়াইট বোর্ড টার দিকে অনিমেষ তাকিয়ে থাকা তিয়ার মনোযোগ পাওয়া যাচ্ছে না কিছুতেই। মনঃসংযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে হালকা করে শিস বাজালো। তবে দুর্ভাগ্যের কারনে সেই শিসের শব্দ টা একটু বেশিই জোড়ালো হয়ে গেল। ক্লাস রুমে থাকা প্রতি টা নেত্র তাকালো শব্দের উৎস অনুসারে। টিচার ক্লাসে থাকা অবস্থায় কোনো শব্দ করা কে যেখানে পাপ হিসেবে ধরা হয় সেখানে মুখ দিয়ে শিস বাজানো তো মহাপাপ। আর এই মহাপাপকর্ম করেছে আওয়ান। রোষ মেশানো দৃষ্টি তে তাকালেন প্রফেসর। এক বার ক্ষমা প্রার্থনা করতেই ঝাঁঝ মেশানো কন্ঠে ভদ্রলোকের জ্ঞান শুরু হলো। এতো টাই জোড়ালো সেই জ্ঞান যা সহ্য করতে না পেরে ব্যাগ পত্র গুটিয়ে এক প্রকার পালিয়ে গেল ছেলেটা। পুরো ক্লাসে হাসির রোল পরে গেছে। স্কেল দিয়ে শব্দ করে প্রফেসর বললেন
” সাইলেন্ট এভরি ওয়ান। ”

নীরবতায় ছেয়ে গেল ক্লাসের প্রতি টি স্থান। কিয়ৎক্ষন পর তিয়া ও বের হয়ে গেল। পুরো ক্লাসের দৃষ্টি তখন ওর পদচারণে। কেউ কেউ সাহসের প্রশংসা না করে ঠিক থাকতে পারলো না বোধহয়। আর তাঁর ফল স্বরূপ ধমকে উঠলেন ম্যাথ প্রফেসর শঙ্কর ভট্টাচার্য।

মাঠে এসে পা দিয়ে মাটি তে আঁকিবুকি করছিলো আওয়ান। সুদূর থেকে ভেসে আসা কন্ঠের মতো কিছু শব্দ কানে এলো।
পেছন থেকে অবিরতহীন ভাবে ডেকে যাচ্ছে তিয়া। কাছে এসে শ্বাস নিতে নিতে বলল
” কি বলবি বল। ”

” আমি কখন কি বলবো? ”

” এড়িয়ে যাবি না তুই। আমি কিন্তু দেখেছি আমাকে ইশারা করছিলি। ”

” ও ঐ টা, আসলে হয়েছে কি। ”

” কি হয়েছে বল। হেয়ালিপানা পছন্দ নয় আমার। ”

” একটা মেয়ে কে পছন্দ হয়েছে। কিন্তু বলতে পারছি না। হেল্প কর না দোস্ত। ”

*

কয়েক প্লেট খাবার দিয়ে ওয়েটার বললেন
” আর কিছু লাগবে ম্যাম? ”

” না না ঠিক আছে। লাগলে জানাবো আমরা। ”

” ওকে ম্যাম। ”

” পোজ্জল, শাম্মি হয়েছে তদের? ”

” হ্যাঁ সব কিছু কমপ্লিট। ”

” ওকে এদিকে আয়। ”

চার পাশে চোখ বুলিয়ে নিলো তিয়া। লিস্ট অনুযায়ী সব ঠিক ঠাক। মোটামুটি ভাবে বার্থডে পালনে যে সকল আয়োজন করা হয় তাঁর সব ই করা হয়েছে। তবে সত্যিকার অর্থে আজ ওদের কারো জন্মদিন ই নয়। তবু ও অভিনয় চালাতে হবে। কয়েক টি টেবিলের পরে বসে চকলেট ব্রাউনি তে চামচ দিয়ে নাড়া চাড়া করছিলো সানিন। সব টা মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে ঠিক তবে কাউ কে প্রশ্ন করার প্রয়োজন বোধ করছে না। শুধু দেখে যাচ্ছে নির্বিকার ভঙ্গিমায়। চেঞ্জিং সাইট থেকে কস্টিউম চেঞ্জ করে এসে একটা চেয়ারে বসলো আওয়ান। লাল রঙের সুট বুড পরে একদম ফিটফাট রাজকুমার। শাম্মি তো চোখ থেকে কাজল নিয়ে নজর টিকাই দিয়ে দিলো। হাত দুটো ভাঁজ করে কানের কাছে ঘুরিয়ে বলল
” দোস্ত আগে জানতাম মেয়েদের রূপ সব গলে গলে পরে। তবে আজকে আরেক টা ধারনা যোগ হলো অন্য কোনো ছেলেদের না হলে ও তোর রূপ ঝর্নার মতো ঝরে ঝরে পরে। ”

” বাজে কথা বলবি না শাম্মি। অনেক দিন হলো হাতের জোড় দেখাই না। তাই বলে আমার সাথে মজা! ”

” খারাপ কি বলেছে সত্যিই তোকে খুব সুন্দর লাগছে। ”

প্রোজ্জল এর করা প্রশংসায় আত্মগরিমা চলে এলো। আওয়ানের শুভ্র মুখের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি তে এসির ঠান্ডা সমীরন এসে স্পর্শ করে গেল। যত্নে বড় হয়ে যাওয়া চুল গুলো কপালে আঁচড়ে পরেছে কেমন। এই মারাত্মক রূপে অনেকের হার্ট বিট মিস হয়ে গেছে নিশ্চিত। কিন্তু তিয়াশা ফিরে ও তাকাচ্ছে না। কোমরে হাত গুঁজে দিয়ে শুধালো আওয়ান
” আমাকে কেমন লাগছে রে তিয়া? ”

” ভালো। ”

” শুধু ভালো? ”

” তো! আর কেমন লাগবে। রোজ রোজ তোর বাঁদর মুখ খানা দেখে আমার অন্তর তো ঝলসেই গেছে। ”

মেয়েটির চুল টেনে ধরলো আওয়ান। দাঁতে দাঁত চেপে বলল
” তুই কোন রাজ্যের রূপসী রে। ”

” মেঘ রাজ্যের রাজকন্যা আমি। বৃষ্টির মতো সুন্দর। ”

” কোথাকার কে , বলে আমি শাহজাহানের বেগম! ”

” আর যাই হোক তোর মতো বাঁদর নই। ”

” আমি বাঁদর হলে পেত্নির মতো ঝগড়াটে তুই। ”

তিয়ার চুল ছেড়ে দিয়ে চলে গেল সে। এই মেয়ের সাথে কথা না বলাই উত্তম। মুখের মধ্যে যেন বিছুটি লাগানো।

গেট দিয়ে দৌড়ে এলো জিমাম। হাতের ইশারা দিয়ে বলল
” এসে গেছে। ”

চট করেই বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো আওয়ান। কেকে শেষ মোম টা লাগিয়ে তিয়াশা ও সামনে চলে এলো। সুমিতার সাথে কথা বলতে বলতে আসছে একটি অতি সুন্দরী মেয়ে। নিঃসেন্দহে যে কোনো নারী ও মুগ্ধতায় বা ঈর্ষায় কেঁপে উঠবে। সেখানে পুরুষ দের অবস্থা কাহিল না হয়ে কি করে পারে! প্রথম বর্ষে এডমিশন নিয়েছে এবার। রেস্তরায় ঢুকে সবাই কে হা হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভরকে গেল মেয়েটি। পরিস্থিতি সামলে নিতে কন্ঠ বাজিয়ে সুমিতা বলল
” হ্যালো গাইস এই হলো আমাদের প্রিন্সিপাল স্যারের বন্ধুর মেয়ে মধুপ্রিয়া। ”

” হাই। ”

সকলের সাথে কুশল বিনিময় করলো মধু। সুমিতা চোখ টিপে ইশারা করলো আওয়ান কে। হঠাৎ করেই ছেলেটা মনোভাবে বিচরণ করছে ভীত সন্ত্রস্ত। তিয়াশার ধাক্কা খেয়ে কাছে গেল আওয়ান। হাত বাড়িয়ে বলল
” হাই। আমিই তোমাকে ইনভাইট করেছি মধু। উপ্স স্যরি মধুপ্রিয়া। ”

” ইটস ওকে আমাকে সবাই মধু বলেই ডাকে। আপনি ও ডাকতে পারেন। ”

জবাবে প্রসন্ন হলো আওয়ান। ইচ্ছাকৃত ভাবে মধুপ্রিয়া থেকে শর্ট করে মধু বলে ডেকেছে সে। সানিন এবার যেন কিছু একটা আঁচ করতে পারলো। তবে বিষয় টা ভালো লাগছে না ওর। সবাই যে যাঁর মতো জুস নিচ্ছে। তিয়া এসে ফিস ফিস করে বলল
” কি হচ্ছে কি আওয়ান! মেয়েটা কে ট্রিট করবো কি আমরা? ”

” আমি পারবো না রে। ”

” গাট্টা মারবো। যা বলছি, এখনি যাবি তুই। ”

তিয়ার জোড়াজোড়ি তে কনফিডেন্স বাড়িয়ে মধুপ্রিয়ার কাছে এলো আওয়ান।মেকি হাসি দিয়ে বলল
” আজকের জন্য তুমি আমার স্পেশাল গেস্ট। তাই তোমাকে ট্রিট করা আমার গুরু দায়িত্ব।”

” আমি ঠিক আছি। সবাই তো আছেই। কোনো অসুবিধা হবে না আমার। ”

” এটা বললে কি চলবে মধুপ্রিয়া? আরে চিন্তা করো কেন। আজ বার্থডে বয় তোমার একার নয় আমাদের সকলের ট্রিট করবে। তাই না রে? ”

তিয়ার কথায় সম্মতি জ্ঞাপন করতে মাথা ঝাঁকালো আওয়ান। পরিশেষে আওয়ানের সাথে এগিয়ে গেল মধুপ্রিয়া। পেছন ঘুরে ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দিয়ে থ্যাংকস জানালো তিয়া কে। স্খলিত ভঙ্গিতে টেবিলে বসলো তিয়াশা। প্রচন্ড মাথা ব্যথা করছে। শুধু মাত্র এই বাঁদর ছেলের মুখের পানে চেয়ে মিথ্যে জন্মদিনে হেল্প করে চলেছে।

গ্রুপ : Fatema’s story discussion

✍️
#ফাতেমা_তুজ
#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here